অকালবোধন কী? শরতের দুর্গাপূজা কেন দেবীর অকালবোধন?

অকালবোধন কী ? শরতের দুর্গাপূজা কেন দেবীর অকালবোধন?

অকালবোধন কী ? শরতের দুর্গাপূজা কেন দেবীর অকালবোধন?

অকালবোধন কী?

অকালবোধন হলো প্রচলিত বা শাস্ত্রীয় সময়ের বাইরে দেবী দুর্গার বোধন অর্থাৎ নিদ্রাভঙ্গ করে তাঁকে জাগ্রত করা। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল কালিকাপুরাণ (অধ্যায় ৬০, শ্লোক ২৫–৩৩) এবং বৃহদ্ধর্মপুরাণ (পূর্বখণ্ড, অধ্যায় ২২) এর শাস্ত্রীয় বিবরণী অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা যখন নিদ্রাচ্ছন্ন থাকেন, তখন লঙ্কার যুদ্ধে রাবণ বধের উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার অসময়ে আরাধনা করেছিলেন। বসন্তকালের শাস্ত্রীয় দুর্গাপূজার বাইরে শরতের এই বিশেষ আরাধনাকেই হিন্দু শাস্ত্রে ‘অকালবোধন‘ বলা হয়। মধ্যযুগীয় মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝা রচিত কৃত্তিবাসী রামায়ণ লঙ্কাকাণ্ড গ্রন্থের অন্তর্গত শ্রীরামের দুর্গাপূজা উপাখ্যানের মাধ্যমে এই ধর্মীয় প্রথাটি বাঙালির সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মননে স্থায়ী রূপ লাভ করে।

ঘন নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসিয়ে, কাশ ফুলে দোলা দিয়ে, শিউলির গন্ধে মাতোয়ারা করে মর্তে শরতের আগমন ঘটে। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি বাঙালির হিয়া উদ্বেলিত হয়ে ওঠে মা দুর্গার আগমনী বার্তায়। কৃত্তিবাসী রামায়ণের হাত ধরে ত্রেতাযুগে লঙ্কার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই অকালবোধনই আজ বাঙালির প্রাণের শারদীয় দুর্গোৎসব।

শরৎকালের দুর্গাপূজাকে অকালবোধন বলা হয় কেন?

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই অকালবোধনের ওপর। এর পেছনে রয়েছে গভীর মহাজাগতিক ও পৌরাণিক কারণ:

দেবতাদের রাত্রি: হিন্দু কালগণনা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান পদ্ধতি অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাস (উত্তরায়ন) হলো দেবতাদের দিন এবং পরের ছয় মাস (দক্ষিণায়ন) দেবতাদের রাত। শরৎকাল এই দক্ষিণায়নের অন্তর্ভুক্ত, যা দেবতাদের গভীর ঘুমের সময়।

অসময়ের পূজা: দেবী দুর্গার পূজার মূল বা শাস্ত্রীয় সময় হলো বসন্তকাল, যা ‘বাসন্তী পূজা‘ নামে পরিচিত। মহাজাগতিক নিয়ম ভেঙে দেবতাদের ঘুমের এই অসময়ে বা ‘অকালে’ দেবীকে জাগ্রত (বোধন) করা হয়েছিল বলেই একে অকালবোধন বলা হয়।

মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার বোধন কেন করা হয়?

দেবতাদের ঘুমের সময় কীভাবে মহামায়াকে জাগ্রত করা সম্ভব, তা নিয়ে যখন সবাই দিশেহারা, তখন পরম পিতা ব্রহ্মা শ্রীরামচন্দ্রকে পথ দেখান।

কালিকাপুরাণের ৬০তম অধ্যায়ের বিবরণ অনুযায়ী, ব্রহ্মা তাঁর দিব্যদৃষ্টিতে জানতে পারেন যে দেবী দুর্গা তখন মর্ত্যের এক পবিত্র বিল্ববৃক্ষ বা বেল গাছের সবুজ পাতার আড়ালে এক ছোট্ট কন্যারূপ ধারণ করে নিভৃতে ঘুমাচ্ছেন। ব্রহ্মার পরামর্শ মেনে শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি থেকে শুক্লা নবমী পর্যন্ত পরম নিষ্ঠার সাথে ব্রত পালন করেন।

অবশেষে মহাষষ্ঠী তিথিতে বিল্ববৃক্ষমূলে গিয়ে তিনি দেবীর ঘুম ভাঙানোর জন্য বিশেষ স্তবগান শুরু করেন এবং মায়ের প্রথম ‘বোধন‘ ও ‘আবাহন‘ সম্পন্ন হয়। ত্রেতাযুগের এই আদি প্রথাকে মান্য করেই আজও বিশ্বজুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় বেলগাছের মূল ও পাতাকে সাক্ষী রেখে বোধন ও অধিবাসের মাধ্যমে শুরু করেন।

সন্ধিপূজা কেন করা হয় এবং ১০৮টি নীলপদ্মের কাহিনি কী?

দুর্গাপূজার সবচেয়ে অলৌকিক এবং আচারগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হলো মহাষ্টমী ও মহানবমী তিথির মিলনের এই সন্ধিপূজা।

সন্ধিপূজার আচারগত তাৎপর্য

পঞ্জিকা ও শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট—এই মোট ৪৮ মিনিটের ক্ষণটিকে ‘সন্ধিক্ষণ’ বলা হয় এবং এই সময়েই সন্ধিপূজা বিহিত।

পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, এই সন্ধিক্ষণেই দেবী দুর্গা ‘চণ্ডী‘ রূপ ধারণ করে অসুর সেনা চণ্ড ও মুণ্ডের সংহার করেছিলেন। তাই এই সময়ে দেবীকে চামুণ্ডা রূপে পূজা করা হয়।

শ্রীরামের নীলপদ্ম উৎসর্গের প্রচলিত কাহিনি

লঙ্কার যুদ্ধজয়ের উদ্দেশ্যে দেবীর পূর্ণ কৃপা ও বর পাওয়ার জন্য এই পরম লগ্নেই শ্রীরামচন্দ্র দেবী চণ্ডীর মহাশক্তির আরাধনায় মেতে ওঠেন। কৃত্তিবাসী রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ড উপাখ্যান অনুযায়ী, পূজার জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল ১০৮টি বিরল নীলপদ্ম। কিন্তু শ্রীরামের ভক্তির গভীরতা পরীক্ষা করার জন্য দেবী মহামায়া পূজোর থালি থেকে একটি পদ্ম অলৌকিকভাবে লুকিয়ে ফেলেন।

একটি পদ্ম কম দেখে শ্রীরামচন্দ্র যখন চরম ব্যাকুল, ঠিক তখনই তাঁর মনে পড়ে, শৈশবে তাঁর মাতা কৌশল্যা তাঁকে পরম স্নেহে ‘রাজীবলোচন’ বা ‘কমলনয়ন‘ বলে ডাকতেন, যার অর্থ হলো যার চোখ দুটি দেখতে পদ্মের মতো সুন্দর। তাই নিখোঁজ ১০৮তম পদ্মের ঘাটতি পূরণ করতে তিনি ধনুকের তীক্ষ্ণ বাণ দিয়ে নিজের একটি চোখ উপড়ে দেবীর চরণে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হন, আর ঠিক তখনই দেবী দুর্গা সশরীরে আবির্ভূত হয়ে শ্রীরামচন্দ্রের হাত ধরে ফেলেন। রামচন্দ্রের এই নজিরবিহীন ভক্তি ও সর্বোচ্চ ত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁকে লঙ্কা জয়ের মোক্ষম বরদান করেন।

সীতা কি সত্যিই রাবণের কন্যা ছিলেন? বিভিন্ন রামায়ণের ভিন্ন বিবরণ

প্রচলিত ও সর্বজনস্বীকৃত বাল্মীকি রামায়ণের বাইরে কিছু আঞ্চলিক ও প্রাচীন গ্রন্থে সীতার জন্ম নিয়ে সীতা কি সত্যিই রাবণের কন্যা ছিলেন? বিভিন্ন রামায়ণের ভিন্ন বিবরণ
প্রচলিত ও সর্বজনস্বীকৃত বাল্মীকি রামায়ণের বাইরে কিছু আঞ্চলিক ও প্রাচীন গ্রন্থে সীতার জন্ম নিয়ে ভিন্ন এবং রহস্যময় কাহিনি পাওয়া যায়। তবে এটিকে একমাত্র বা মূল ইতিহাস হিসেবে গণ্য করা ভুল হবে।

অদ্ভুত রামায়ণের বিবরণ

মহর্ষি বাল্মীকি রচিত বলে খ্যাত প্রাচীন শাক্ত–বৈষ্ণব গ্রন্থ অদ্ভুত রামায়ণ-এর অষ্টম সর্গের গবেষণামূলক আলোচনা থেকে জানা যায়, রাবণের পত্নী মন্দোদরী ঋষিদের রক্তের দ্বারা অভিশপ্ত একটি দুগ্ধ পাত্র পান করার পর গর্ভবতী হন। লোকলজ্জা ও রাবণের ভয়ে তিনি লঙ্কা ত্যাগ করে কুরুক্ষেত্রের পবিত্র ভূমিতে যান এবং সেখানে গর্ভস্থ ভ্রূণটিকে মাটির নিচে সমাহিত করেন। পরবর্তীতে মিথিলার রাজা জনক যজ্ঞের ভূমি চাষ করার সময় লাঙ্গলের ফলায় (সীত) সেই মাটির নিচ থেকেই কন্যাসন্তানটিকে উদ্ধার করেন এবং তাঁর নাম রাখেন সীতা।

অন্যান্য আঞ্চলিক লোকগাথা

কিছু কিছু তিব্বতি ও কাশ্মীরি রামায়ণের লোকগাথায় ভিন্ন রূপান্তর দেখা যায়, যেখানে বলা হয় রাবণের প্রথমা কন্যা তার মৃত্যুর কারণ হবে—এই জ্যোতিষীয় ভবিষ্যদ্বাণীর কারণে শিশুটিকে একটি মায়াবী কলসে বন্দি করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা পরে মিথিলার তীরে পৌঁছায়। যেহেতু এই বিবরণগুলো মূল বাল্মীকি রামায়ণের অংশ নয়, তাই এগুলোকে সনাতন ধর্মের মূল ধারার চেয়ে বিকল্প পৌরাণিক উপাখ্যান বা আঞ্চলিক লোকগাথা হিসেবেই বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত।

সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. অকালবোধনের অর্থ কী?

‘অকাল’ মানে অসময় এবং ‘বোধনের’ অর্থ ঘুমন্ত সত্ত্বাকে জাগানো। অর্থাৎ, দেবতাদের ঘুমের সময়ে দেবীর নিদ্রাভঙ্গ করার আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়াকে অকালবোধন বলে।

২. রামচন্দ্র কোন ঋতুতে দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন?

শ্রীরামচন্দ্র শরৎ ঋতুতে (আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে) দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন।

৩. দেবীর বোধন সাধারণত কোন তিথিতে হয়?

দুর্গাপূজার মূল আচার হিসেবে দেবীর বোধন সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠী বা মহাষষ্ঠী তিথির সন্ধ্যায় বেলগাছের তলায় সম্পন্ন হয়।

৪. সন্ধিপূজায় ১০৮টি পদ্মের গুরুত্ব কী?
কৃত্তিবাসী রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডের বিবরণী মতে, দেবী চণ্ডীর আরাধনায় শ্রীরামচন্দ্র ১০৮টি নীলপদ্ম উৎসর্গ করেছিলেন। এই ভক্তি ও বলিদানের স্মৃতিকে স্মরণ করে আজও সন্ধিপূজায় দেবীর চরণে ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদন করা বাধ্যতামূলক আচার।

৫. বাসন্তী পূজা ও শারদীয় দুর্গাপূজার মধ্যে পার্থক্য কী?
বসন্তকালে যে দুর্গাপূজা হয় তা হলো আদি ও শাস্ত্রসম্মত ‘বাসন্তী পূজা’। অন্যদিকে, শরৎকালে শ্রীরামচন্দ্র কর্তৃক অসময়ে দেবতাদের ঘুমের মধ্যে যে পূজার প্রচলন হয়, তা হলো ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’ বা ‘অকালবোধন’।

Author Bio

Related Posts